প্রথমেই বলে রাখা ভাল যে ভাষা দিবসের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমি চিরকাল সন্দিহান । ভাষা কে অতিরিক্ত আমল দেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করি না । মনুষ্যজাতির সাত হাজারের বেশি ভাষার মধ্যে যে মা-বাবার কাছে ভুলক্রমে সে জন্মেছে তারা যে ভাষায় কথা বলে সেই একটি ভাষা কে নিয়ে কেউ আহ্লাদিত হয়ে উঠবে, এটা আমার বেশ অযৌক্তিক মনে হয় ।
উপরন্তু, বাংলা ভাষা নিয়ে ইদানিং গর্ব করার মত উপাদান ক্রমশই কমে চলেছে । সমাজমাধ্যমে বাংলা ভাষার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া নিয়ে গরম-গরম বাতেলা শুনে আমরা হে-হে করে হেসে উঠি, লাইক ঠুকে দিই, একটু আহা-উহু করি । অপরাধবোধ যদি খুব প্রবল হয়, তাহলে পরের দিন অফিসে গিয়ে ইমেলে লেখা ইংরেজির মনে-মনে বাংলা অনুবাদ করার চেষ্টা করি । যথারীতি গর্ববোধের গর্ভপাত ঘটে । শুধু গুজরাটি বা মাড়োয়ারি কাউকে নিরামিষ খেতে দেখলে অথবা কোনো বিহারি মুটে কে পানের পিক ফেলতে দেখলে নবকলেবরে আমাদের মিনিটখানেক বা বড়জোর আধঘন্টার জাতিগত নবজাগরণ ঘটে ।
এত কলরবের ভিড়ে আমার অতি নগণ্য উপলব্ধি এই যে প্রতিদিনের বাক্যালাপের চর্বিতচর্বণে কখনই ভাষার প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা গজিয়ে ওঠে না । ঠিক যেমন পঁচিশে বৈশাখ এলেই হটাৎ করে বাচ্চা কে ক্যাটক্যাটে হলুদ পাঞ্জাবি পরিয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করালেই সে রাবীন্দ্রিক হয়ে ওঠে না । ভাষার প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে মানুষের মনের অতল গভীরে, তার আপাত অব্যক্ত অনুভূতি তে । বাংলা ভাষা লুকিয়ে আছে গঙ্গার ওপর নুইয়ে পড়া গাছের পাতার মধ্যে ঝিম ধরিয়ে নেমে আসা সন্ধ্যার ভিতর । বাংলা ভাষা লুকিয়ে আছে উন্মুক্ত মাঠের ধূ-ধূ প্রান্তরে । বাংলা ভাষা লুকিয়ে আছে জীবনের তুচ্ছ কোনো সাফল্যে গৌরবান্বিত হয়ে সূর্য্যের দিকে জ্বলে যাওয়া চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকার স্পর্ধায় । বাংলা ভাষা লুকিয়ে আছে অত্যন্ত রূঢ়ভাষী, খিটখিটে মেজাজের মানুষের ভিতর লুকিয়ে থাকা আজন্ম অপমান ও লাঞ্ছনার তাড়নায় । বাংলা ভাষা মিশে আছে বিয়ের দশ বছর পরেও স্বামীকে ভালো না বেসে উঠতে পারা কোনো নারীর দীর্ঘশ্বাসে । বাংলা ভাষা মিশে আছে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে গোটা পৃথিবী জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিতে চাওয়া ইচ্ছার হাহাকারে । বাংলা ভাষা লুকিয়ে আছে ছাদ থেকে ঝাঁপ দিতে চাওয়া কারুর জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়ায় ।
অন্ধকার মাটির ঘরে টিম-টিম করে কুপির আলো জেগে ওঠে । গ্রামের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের দিন শেষ হয় । গৃহিণী সারাদিনের পরিশ্রমের পর তন্দ্রাচ্ছন চোখে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আগামীকাল কিভাবে সংসার চলবে সেই ভাবনা নিজের ভিতর চেপে রেখে ঘুমিয়ে পরার চেষ্টা করে । তার স্বামী তাদের বাড়িতে রাখা পুরোনো দিনের পুঁথির স্তুপের দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবে যে সেও নিশ্চয়ই তার পূর্বপুরুষদের মত কাব্যগ্রন্থ, পালার গান লিখতে পারবে | খোকাও পড়াশোনা ভালোবাসে | তাকে ভালভাবে লেখাপড়া শেখাতে হবে | তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে | হটাৎ অসময়ের মেঘের মত তার মনে উপার্জনের চিন্তা ভিড় করে আসে | তিনি ভালোই বুঝতে পারেন যে এই পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি করার উপায় তার জানা নেই | চেষ্টা করেও হয়ত তিনি এই অভাব ঘোঁচাতে পারবেন না | হয়ত ভবিষ্যতে এই মেরামতের অভাবে জীর্ণ হয়ে যাওয়া পৈতৃক ভিটা ছেড়ে দূরে, কাশী বা অন্যত্র কোথাও তাদের চলে যেতে হবে | তার গভীর দীর্ঘশ্বাস ঘুমন্ত গ্রামের বাতাসে মিশে যায়। এদিকে তার দুই সন্তান- একজন ছেলে আরেকজন মেয়ে- তাদের মন সম্পূর্ণ অন্য চিন্তায় বিভোর | মেয়েটি ভাবছে তার খেলার কথা, খেলার সাথীদের কথা, একটা সামান্য অতি সাধারণ গলার হার লুকিয়ে রাখার কথা, ঝরে মাটিতে পড়ে থাকা আম-পেয়ারা কুড়ানোর কথা | তার বহুদিনের স্বপ্ন কাশবনের মাঝে ছুটন্ত রেলগাড়ি দেখতে যাওয়ার কথা | ছেলেটি ভাবে পাঠশালার কথা, বইয়ের কথা, যাত্রাপালার কথা, তার রাংতার মুকুটের কথা | আশ্চর্য্য, অজানা এক বিশ্বের কথা ভেবে ছেলেটি হতবাক হয়ে যায় | রাতের নিস্তব্ধতা কে আরও দৃঢ় করে তাদের গরু বাইরে থেকে হটাৎ ডেকে ওঠে |
এইসব অলীক, ঐশ্বরিক, কখনো অলৌকিক অনুভূতির মধ্যেই ভাষা লুকিয়ে থাকে | আমাদের মধ্যে এবং চারপাশে ঘটে চলা সহস্র ঘটনা ও অনুভূতির মন্থনে ভাষা জন্মগ্রহণ করে | সেই ভাষাকে এক ফালি সাদা কাগজে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে জন্ম নেয় অ, আ..ক, খ..
যদি সত্যিই আমাদের মধ্যে ভাষার বিপন্নতা কে কেন্দ্র করে শঙ্কার ডঙ্কা বেজে ওঠে, তাহলে বুঝতে হবে যে তা শুধুমাত্র অন্য বিজাতীয় ভাষার রমরমার জন্য নয়, রেডিওতে বাংলা গান না হওয়ার জন্য নয়, বাংলা মিডিয়ামে ভালো স্কুল না থাকার জন্যে নয়, কর্পোরেটে ইংরেজি কপ্চাতে বাধ্য হওয়ার জন্য নয় | এগুলো রোগের লক্ষণমাত্র | এর মূল কারণ আজ আমাদের মনোজগৎ বিপন্ন | আমরা যে ভাবে বড় হয়েছি, যে ভাবে কথা বলেছি, যে ভাবে ভালোবেসেছি, যে ভাবে ক্ষেপে উঠতে শিখেছি, যে ভাবে ঘৃণা করেছি, যে ভাবে হেসেছি-কেঁদেছি-রেগেছি-অভিমান করেছি তার সমস্ত কিছুর প্রতিই আমাদের অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যের মনোভাব, তাকে ছোট-পুরোনো-বাতিল বলে ভাবার মনোভাব হল এর আসল কারণ | আত্মবিস্মৃতির অতলে আমরা অবলীলাক্রমে নিজেরা তলিয়ে গেছি ও অন্যদের তলিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছি | কেউ-কেউ বলেন যে আগামী তরুণ প্রজন্ম বিশেষভাবে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি বিমুখ | এই অভিযোগ সত্যি মেনেও আমি তাদের এর জন্যে এককভাবে দায়ী করতে অপারগ | তারাই তো দেখেছে তাদের মা বাবাকে একই জীবনে সম্পূর্ণভাবে পাল্টি খেয়ে যেতে | যে মা-বাবা কে সে ছোটবেলায় দেখেছে তেমন আর্থিক প্রতিপত্তি না থাকা সত্ত্বেও রবীন্দ্রসংগীতে, শিল্প-সাহিত্য চর্চায় আনন্দের রসদ খুঁজে নিতে, বারো ক্লাসের পর সেই মা-বাবা কে সে দেখছে অন্যের উস্কানিতে পা দিয়ে ছেলে-মেয়েকে নামধারী কোনো কলেজের ইঞ্জিনিয়ার করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতে | তাদের আত্মীয়দেরকে সে দেখছে বেপরোয়া ভাবে জীবনের সমস্ত পুঁজি নিঃশেষ করে, প্রয়োজনে আরও বেশি ধার করে মেয়ের বিয়েতে পার্টি দিতে | তাদের বন্ধুদের অনেক বাবা-মা -রা হয়ত বাজার করা, রান্না করা যে কি বস্তু তা হয়ত জানেই না | হয় চাকর বাজার করে নিয়ে আসে আর রান্নার লোক রান্না করে , নয়ত কোনো ডেলিভারি সার্ভিসের লোক কাঁধে করে রাতের খাওয়ার নিয়ে ঘরে ঢোকে | বাংলা ভাষাকে শুধুমাত্র মাতৃভাষা বলে, দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সংগীত এতে লেখা হয়েছে বলে, এশিয়ার প্রথম সাহিত্যের নোবেল এই ভাষায় এসেছে বলে সম্মান করতে হবে- এর থেকে হাস্যকর যুক্তি আর নেই | যদি সম্মান করতেই হয়, তাহলে সম্মান করতে হবে নিজেকে, নিজের অনুভূতিকে, নিজের মনোজগৎ-কে | নিজের বাড়িকে, নিজের পরিচয় কে, নিজের পরিবার কে, নিজের ঐতিহ্য কে | মূল্য দিতে হবে সেই পরিবারের মূল্যবোধ, জীবনদর্শন, চিন্তাভাবনা কে | এর কারণ কোনো কাল্পনিক শ্রেষ্ঠতা নয় | এর কারণ এর সঙ্গে আমার নিজস্ব অস্তিত্ব, আমার বাঁচা, আমার বড় হওয়া, আমার প্রকৃত অর্থে ভালো থাকা অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত | নিজেদের ঠিক-ভুল, উচিত-অনুচিত কে আমাদের মানবিকতা দিয়ে, শিক্ষা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে নিজেদের বুঝতে হবে- কোনো বিজাতীয়, বিদেশী উস্কানির সাহায্যে নয় | এই সবকিছু মিলিয়ে মিশিয়েই একটি সমাজ, জাতি বা দেশের স্বধর্ম রচিত হয়, আর "স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়, পরধর্ম ভয়াবহ" |
পরিশেষে একটু রসিকতা করার লোভ সামলানো দুষ্কর | হ্যারিংটন স্ট্রিট কে সদর্পে হো-চি-মিন সরণি ঘোষণা করা পার্টি আজ আক্ষরিক অর্থেই মহা-"শূন্যে" বিলীন হয়ে গেছে | বোঝা যায় যে এই মহাবিশ্বে ইতিহাসবিমুখতার ও নিজেকে ভুলে থাকার কোনো ক্ষমা নেই |

