Monday, 27 May 2019

রবীন্দ্রনাথ কে



সভয়ে তাকিয়েছি কালরাত্রির মুখে
চাঁদ, সে যে কয়েক যুগ রাহুগ্রাসে তলিয়ে
আমি একা- আমার পাশে শ্মশানের চিতা
চিতার আগুন লকলকে-লকলকে--দাহ্যপদার্থ পুড়ছে
দুনিয়ার মরাখেকোর হুক্কা-হুয়া

আমি একা বসে থাকি নদীতীরে
শতাব্দীর চরা পড়ে মজেছে মোহনা
শতাব্দীর চরায় আটকে জাহাজ- হালভাঙা
ক্যাপ্টেন নিখোঁজ অন্ধকারে
যারা ডুব সাঁতার জানত-পালিয়েছে সমুদ্র গভীরে

পায়ের তলায় ছাই-আর সভ্যতার রক্তবমি
সারা শরীরে মাছি ভনভন ঘা-
দু-পাঁচটা চিতার চ্যালাকাঠ খেয়ে বমি করেছি মধ্যরাতে
এবার পালা আত্মহত্যার, এবারের ডাক পুড়ে ছাই হওয়া
ঝাঁপ দিয়েছি শ্মশান মাঝে চিতার বুকে

তপ্ত--তপ্ত অনলের বুকে ফুল ফোটে? বিশ্বাসযোগ্য?
সবাই বোধহয় আগুনে মরে না, কেউ কেউ ওঠে জেগে
কেউ কেউ দেখে মরাখেকোরা পালিয়ে যাচ্ছে জীবন দেখে
আজ বেহালায় ভৈরব-ভৈরবী বাজে গহন বনে
চিতার আগুনে ভোরের আকাশ ফরসা হয়েছে পুবের কোণে

এই সুর্য্য আত্মাহুতিতে জ্বলে
সুরগুলো সব আঘাতে আঘাতে অমর আনন্দ পায়
হিমালয় আজ প্রবল উল্লাসে গর্জে উঠতে চায়
আনন্দে আজ পাগল হও, অমর মত্ত কবি
চির অমাবস্যা মাঝে, এ কোন আগুন, এ কোন রবি?


Wednesday, 22 May 2019

"গঙ্গা গঙ্গার তরঙ্গে..."

"গঙ্গা গঙ্গার তরঙ্গে প্রাণপদ্ম ভাসাইলাম রে
  গঙ্গা রাখিয়ো যতনে বুকে নিয়া
  মাগো দুলাইয়ো আষাঢ় ঢেউ দিয়া রে....."

গাড়ি চেপে উত্তপ্ত কলকাতার রাস্তায় চলেছিলাম | গাড়িতে রেডিও বাজছিল | এফ.এম স্টেশনগুলোর হিন্দি-ইংরেজি-বাংলার জগাখিচুড়ি ভাষায় বাজারি ন্যাকামো শুনে প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠায় এ.এম রেডিও চালালাম | এফ.এম -এর তুলনায় এ.এম রেডিওর শব্দ অনেক নিম্নমানের | পাশ দিয়ে অন্য গাড়ি একটু জোরে ওভারটেক করলে "নয়েস" হয় | যাইহোক, স্ক্যান করে একটা নাম না জানা স্টেশনে মোটামুটি ভালো মানের শব্দ পাওয়া গেল | একটা খুব সুন্দর শ্যামাসংগীত শুনলাম | পান্নালাল ভট্টাচার্য্যের গাওয়া | তারপরেই এই গানটা | অনুষ্ঠানের কথক শিল্পীর নাম উল্লেখ করলেও এখন আমার মনে নেই | পরে বাড়ি ফিরে ইন্টারনেটে দেখলাম যে "গঙ্গা" সিনেমাটিতে লোকগীতির প্রখ্যাত শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরী এই গানটি গেয়েছিলেন |
              আমি জীবনে অনুভব করেছি যে সুরের এক অপার্থিব শক্তি আছে | মনের, এবং মনের ওপারে বোধের সমস্ত অলিগলির হিসেব মনে হয় একমাত্র সুরের কাছেই আছে | এই গানটা শুনেও আমার এরকমই মনে হল | যার ওপর মানুষের কোনো জোর খাটে না, অথচ যাকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করে থাকি আমরা, তা হল জীবন | আমাদের সবার জীবন কি গঙ্গার মতই চিরপ্রবাহিতা নয় ? সেখানে কেউ ঢিল ফেলে, কেউ প্রদীপ ভাসায় |
   জীবন অনিয়ন্ত্রিত জেনেও মানুষমাত্রেই স্বপ্ন দেখে | প্রতিদিন চেষ্টা করে একটা নতুন সূর্যোদয় প্রত্যক্ষ করার | কেউ পারে, কেউ পারে না | তবুও স্বপ্ন আমাদের চোখ রঙিন করে | অসাধারণ শিল্পের জন্ম দেয় সভ্যতা | তাই সে মা গঙ্গার কাছে প্রার্থনা করে তার প্রাণপদ্মটিকে বুকে আগলে রাখতে, আষাঢ় ঢেউয়ে দুলিয়ে দুলিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য | গানটি শুনেই কয়েকটা দৃশ্য, কয়েকটি নাম মনে পরে যায় | আমার সদ্য পড়া শেষ হওয়া "তিতাস একটি নদীর নাম" | বিভূতিভূষণের "ইছামতি" | ঋত্বিক ঘটকের অপূর্ব "সুবর্ণরেখা" | "অপুর সংসার "-এ অপূর্ব কুমার রায় পুলুর সাথে নৌকায় চলেছে | সুবল আর কিশোর তিতাসে নৌকো বাইছে | সে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা |এ আমাদের বাংলার নিজস্ব ছবি, আমাদের নিজস্ব গান | কোনো ধার করা আধখ্যাঁচড়া বিদেশী ঢং নয় |
এই অসাধারণ অভিজ্ঞতায় একটাই খামতি রয়ে গেল | গানটি শুনতে শুনতে জাহ্নবীকে দুচোখ ভরে দেখতে পেলে যে আনন্দ হত, ভাগ্যদোষে তার থেকে বঞ্চিত হলাম | যাই হোক, কিছু অপূর্ণতা থাকা দরকার | অপূর্ণতাই তো মানুষের এগিয়ে যাওয়ার সম্বল |